২০২৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করলেন রাজ্যের অর্থ দপ্তরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীমতী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য্য। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনমুখী দৃষ্টিভঙ্গিকে পাথেয় করে এই বাজেট মূলত রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়ন, নারী ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীকে আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে সাজানো হয়েছে।
১. আর্থিক উন্নয়নের খতিয়ান ও লক্ষ্যমাত্রা
রাজ্য সরকারের নিরলস প্রচেষ্টায় পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে:
- GSDP বৃদ্ধি: ২০১০-১১ সালের তুলনায় রাজ্যের গ্রস স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট (GSDP) ৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬-২৭ সালে ২১.৪৮ লক্ষ কোটি টাকা হতে চলেছে।
- দারিদ্র্য দূরীকরণ: গত কয়েক বছরে প্রায় ১ কোটি ৭২ লক্ষেরও বেশি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার বাইরে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে।
- বেকারত্ব হ্রাস: ২০১৭-১৮ সালের তুলনায় ২০২৩-২৪ সালে রাজ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪৫.৬৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
- কর্মসংস্থান: সরকারি, বেসরকারি ও স্বনিযুক্তি প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যে প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
২. সামাজিক সুরক্ষা ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্প
পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে দেশের মধ্যে অন্যতম সুদৃঢ় সামাজিক সুরক্ষা পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে। বাজেটে এই ধারা বজায় রাখতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে:
- লক্ষ্মীর ভাণ্ডার: বর্তমানে ২.২১ কোটি মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে এই প্রকল্পের মাসিক সহায়তা আরও ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করার ঐতিহাসিক ঘোষণা করা হয়েছে。
- কন্যাশ্রী ও রূপশ্রী: ১ কোটিরও বেশি ছাত্রীকে 'কন্যাশ্রী' এবং ২২ লক্ষেরও বেশি মহিলাকে 'রূপশ্রী' প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
- বাংলার বাড়ি: ১ কোটিরও বেশি পরিবারকে ইতিমধ্যেই নিজস্ব গৃহ প্রদান করা হয়েছে এবং আরও ২০ লক্ষ পরিবারকে দ্বিতীয় পর্যায়ে সহায়তা দেওয়া হবে।
- শ্রমশ্রী: অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক ও ঘরে ফেরা শ্রমিকদের জন্য মাসে ৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
৩. পরিকাঠামো ও শিল্প উন্নয়ন
রাজ্যের সার্বিক অর্থনৈতিক শ্রী ফেরাতে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে:
- পথশ্রী-রাস্তাশ্রী: ইতিমধ্যেই ২ লক্ষ ২০ হাজার কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। চতুর্থ পর্যায়ে আরও ৩০,০০০ কিলোমিটার নতুন রাস্তা তৈরির কাজ শুরু হচ্ছে।
- শিল্প করিডর: রাজ্যে ৬টি প্রধান ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর এবং ২০০-রও বেশি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক কাজ করছে।
- জঙ্গল সুন্দরী কর্মনগরী: ২৭,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে এই শিল্প প্রকল্পটি রাজ্যে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
- MSME সেক্টর: ৯৩ লক্ষ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ইউনিটের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ দেশে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে।
৪. স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে নীরব বিপ্লব
- স্বাস্থ্যসাথী: ২.৪৫ কোটিরও বেশি পরিবার এই কার্ডের আওতায় অন্তর্ভুক্ত এবং ১ কোটিরও বেশি উপভোক্তা পরিষেবা গ্রহণ করেছেন।
- প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব: ২০১১ সালে এই হার ছিল ৬৮.১ শতাংশ, যা বর্তমানে ৯৯.৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
- তরুণের স্বপ্ন: ৫৩ লক্ষেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রীকে বিনামূল্যে স্মার্ট ফোন বা ট্যাব প্রদান করা হয়েছে।
- সবুজ সাথী: ১.৪৪ কোটি ছাত্র-ছাত্রীকে সাইকেল প্রদান করে ড্রপ-আউট হার কমানো সম্ভব হয়েছে।
৫. বাজেট ২০২৬-২৭ এর বিশেষ আকর্ষণ ও ভাতা বৃদ্ধি
বাজেট বিবৃতিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে:
- ভাতা বৃদ্ধি: আশাকর্মী (ASHA), অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী (ICDS) এবং পার্শ্ব শিক্ষকদের (Para-teachers) মাসিক সম্মানি ১,০০০ টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
- সিভিক ভলান্টিয়ার: সিভিক ভলান্টিয়ার ও ভিলেজ পুলিশ কর্মীদের মাসিক ভাতা ১,০০০ টাকা বৃদ্ধি এবং কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
- মহাভাতা (DA): সরকারি কর্মচারীদের জন্য আরও ৪ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা ঘোষণা করা হয়েছে।
৬. বিভাগীয় ব্যয় বরাদ্দ (২০২৬-২৭ প্রস্তাবিত)
বাজেটে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে:
|
দপ্তর |
বরাদ্দ (কোটি টাকা) |
|---|---|
|
পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন |
৪৬,২৯৩.০৯ |
|
মহিলা ও শিশুবিকাশ এবং সমাজকল্যাণ |
৪২,১১৩.৮৫ |
|
বিদ্যালয় শিক্ষা |
৪১,২৩৪.৬৬ |
|
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ |
২২,৩৩৮.০৮ |
|
স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক |
১৬,৪৩৯.১২ |
উপসংহার
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের এই বাজেট কেবলমাত্র একটি আর্থিক হিসাব নয়, বরং এটি পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ অগ্রগতির দলিল। শিল্প পুনরুত্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে রাজ্যবাসীকে এক উন্নত ও স্বনির্ভর বাংলার স্বপ্ন দেখিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

0 Comments
If you any doubt please let me know