পশ্চিমবঙ্গের সর্বস্তরের মানুষের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে আমাদের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে এখন আমি আগামী অর্থবর্ষের জন্য রাজ্যের বেশ কয়েকটি প্রকল্প ও প্রস্তাব পেশ করছি—

১. আমাদের রাজ্যে মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার মানুষকে প্রতি বছর গঙ্গার ভাঙন থেকে রক্ষা করার জন্য ভাঙন রোধে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু সমস্যাটির একটি চিরস্থায়ী সমাধান আজ বিশেষ প্রয়োজন। এজন্য সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের সাহায্য ও পরামর্শ নিয়ে একটি সার্বিক পরিকল্পনা রূপায়ণ করতে চলেছে।

২. মাননীয় সদস্যগণ জানেন যে, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে ৬টি 'ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক করিডর' তৈরি করার কাজ হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের পরিকাঠামো গঠনে যৌথ অংশগ্রহণের জন্য নামী আর্থিক সংস্থা প্রস্তাব দিয়েছে। এই পরিকাঠামো দ্রুত গঠনের সঙ্গে শিল্প সংস্থাগুলি বিনিয়োগ করবে এবং রাজ্যে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

৩. আপনারা জেনে খুশি হবেন যে, আরও কর্মসংস্থানের প্রচেষ্টায় জলপাইগুড়ি জেলায় দুটি এবং বীরভূম, বাঁকুড়া ও মুর্শিদাবাদ জেলায় একটি করে মোট পাঁচটি নতুন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পার্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

৪. এছাড়াও, রাজ্যে সরকারি জমিতে যৌথ উদ্যোগে একটি উচ্চমানের 'গ্লোবাল ট্রেড সেন্টার' গড়ে তোলা হবে।

৫. রাজ্যে খেলাধুলার উন্নতির জন্য হাওড়ার ডুমুরজলাতে ইতিমধ্যে একটি 'স্পোর্টস সিটি' তৈরি করা হচ্ছে। এবার কলকাতার উপকণ্ঠে বারুইপুরে যেখানে ইতিমধ্যে টেলি অ্যাকাডেমি গড়ে তোলা হয়েছে সেখানে এই অ্যাকাডেমিকে কেন্দ্র করে একটি 'সংস্কৃতি শহর' বা 'কালচারাল সিটি' গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।


৬. আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আমাদের রাজ্যের অনেকগুলি শহরকে আধুনিক করে গড়ে তোলার জন্য সরকার একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এর ফলে শহরগুলি ব্যবসা, পরিবেশ ও কর্মসংস্থান-বান্ধব হবে এবং সেখানে আধুনিক জীবনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে, যেখানে ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের একটি বড় ভূমিকা থাকবে। বর্তমানে হাওড়া, ডায়মন্ড হারবার, বর্ধমান, দুর্গাপুর, বোলপুর, কৃষ্ণনগর, বারাসাত, রায়গঞ্জ, শিলিগুড়ি, বহরমপুর, মালদা, কল্যাণী, শ্রীরামপুর, হলদিয়া, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, দিঘা, মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, নিউটাউনের এন.কে.ডি.এ এলাকা, জঙ্গিপুর, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও দার্জিলিং শহরের জন্য এই আধুনিকীকরণ প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। অধিবাসীদের অসুবিধা না ঘটিয়ে কীভাবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্ভব তা খতিয়ে দেখতে সরকার একটি কমিটি গঠন করবে। এই কমিটি ২০২৬-এর ডিসেম্বরের মধ্যে সার্ভের কাজ শেষ করে রিপোর্ট প্রদান করবে।

৭. রাজ্যের হিমাগারগুলিতে বর্তমানে ৫.৯৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন কোল্ড স্টোরেজ ক্ষমতা আছে এবং পশ্চিমবঙ্গ এ বিষয়ে দেশের মধ্যে প্রথম। মরশুমের সময় উৎপন্ন বাড়তি ফসল ও ফল সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে সরকার যৌথ উদ্যোগে রাজ্য জুড়ে প্রয়োজনীয় এলাকায় আরও ৫০টি নতুন কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করবে।

৮. আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, ক্ষুদ্র চা-বাগান মালিকদের স্বার্থে কাঁচা চা পাতা উৎপাদনের ওপর কৃষি আয়কর (Agricultural Income Tax) ছাড়ের সময়সীমা আগামী অর্থবর্ষের জন্য অর্থাৎ ৩১/০৩/২০২৭ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হল এবং একই সঙ্গে চা উৎপাদনের ওপর লাগু সেস-এর ছাড়ও আরও এক বছর বাড়িয়ে ৩১/০৩/২০২৭ পর্যন্ত করা হল।


৯. আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, এপ্রিল ২০২৬ থেকে 'আশা' (ASHA) কর্মীদের মাসিক সাম্মানিক ১,০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হল। আমি আরও ঘোষণা করছি যে, সরকারি অধীনে অন্য মহিলা কর্মীরা যেমন পেয়ে থাকেন, এখন থেকে আশা কর্মীদের জন্যও ১৮০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া হবে। এছাড়াও কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে তাঁদের নিকট পরিবারকে এককালীন ৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। এজন্য আমি আগামী অর্থবর্ষে ১০০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ প্রস্তাব করছি।

১০. আইসিডিএস (ICDS) কর্মীরা এই রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক শৈশবকালীন যত্ন, শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংক্রান্ত পরিষেবা দিয়ে থাকেন। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও অঙ্গনওয়াড়ি সহায়কদলের মাসিক সাম্মানিক এপ্রিল ২০২৬ থেকে আরও ১,০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হল। কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে আইসিডিএস কর্মীদের নিকট পরিবারকে এককালীন ৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়ার প্রস্তাব রাখছি। এজন্য আমি আগামী অর্থবর্ষে ২৫০ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব রাখছি।

১১. রাজ্যে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত প্যারা-টিচার, শিক্ষাবন্ধু, সহায়িকা, সম্প্রসারক, মুখ্য সম্প্রসারক-সহ স্পেশাল এডুকেটর ও ম্যানেজমেন্ট স্টাফ প্রত্যেকের জন্য মাসিক সাম্মানিক এপ্রিল ২০২৬ থেকে আরও ১,০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হল। কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে এই সকল কর্মীদের নিকট পরিবারও এককালীন ৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য পাবেন। এজন্য ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে আমি ১১০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।

১২. রাজ্যে বর্তমানে ১ লক্ষ ২৫ হাজারেরও বেশি সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ ও গ্রিন পুলিশ পুলিশ প্রশাসনকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় কাজ করে চলেছেন। তাঁদের কাজের স্বীকৃতি দিতে আমি আনন্দের সঙ্গে এই সকল কর্মীদের মাসিক পারিশ্রমিক আগামী এপ্রিল ২০২৬ থেকে আরও ১,০০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব রাখছি। বর্তমানে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুতে এই কর্মীদের নিকট পরিবার ৩ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য পান, এ ক্ষেত্রে এই সাহায্যের পরিমাণ ৩ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লক্ষ টাকা করা হল। এর জন্য আগামী অর্থবর্ষে আমি ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়-বরাদ্দের প্রস্তাব রাখছি।


১৩. আমাদের সরকার অনলাইনে কেনা জিনিসের সরবরাহকে কেন্দ্র করে দ্রুত গড়ে ওঠা নতুন 'গিগ-ইকোনমি'-র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন। আমাদের রাজ্যে এই অর্থনীতির সঙ্গে এক বিশাল সংখ্যক কর্মী যুক্ত। এই সমস্ত গিগ-কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, সকল গিগ-কর্মীদের সরকারি চালু সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় (যেমন স্বাস্থ্যসাথী) আনা হবে।

১৪. আপনারা অবগত আছেন যে, কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনার প্রতিবাদে রাজ্যের জব কার্ড হোল্ডারদের জন্য কাজ নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে 'কর্মশ্রী' প্রকল্প চালু করেছে যা এখন জাতির জনকের নামে 'মহাত্মা-শ্রী' হিসেবে নামাঙ্কিত। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যেক জব কার্ড হোল্ডারের জন্য বছরে ন্যূনতম ১০০ দিনের কাজ নিশ্চিত করা হয়েছে। এই প্রকল্পে প্রয়োজনীয় গতি সঞ্চার করতে আমি আগামী অর্থবর্ষে ২,০০০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ পেশ করছি।

১৫. খেতমজুর ভাই-বোনদের জীবিকা কৃষি ও সংশ্লিষ্ট কাজকর্মের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। এই সকল খেতমজুরদের জন্য ২,০০০ টাকার দুটি কিস্তিতে বার্ষিক মোট ৪,০০০ টাকা আর্থিক অনুদানের প্রস্তাব রাখছি। এই অনুদানের একটি কিস্তি রবি চাষের সময় ও অন্যটি খরিফ চাষের সময় দেওয়া হবে। যে সকল খেতমজুরের নিজস্ব কৃষিজমি না থাকায় 'কৃষকবন্ধু (নতুন)' প্রকল্পের সুবিধা পান না বা যাঁরা ভাগচাষি হিসেবে নথিভুক্ত নন, সেই সকল যোগ্য খেতমজুরেরা এর আওতায় আসবেন। তাঁদের একটি তথ্যভাণ্ডার (ডেটাবেস) তৈরি করা হবে।


১৬. ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের চাষের খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে এখন তাঁদের সরকারি ডিপ টিউবওয়েল বা রিভার-লিফট ইরিগেশন (RLI) ব্যবহারে যে ফি বা চার্জ দিতে হয় তা সম্পূর্ণ মকুব করা হল।

১৭. আমাদের সরকার সর্বদাই রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের চাহিদার বিষয়ে সম্পূর্ণ সংবেদনশীল। তাঁরা সরকারি নীতি ও প্রকল্প রূপায়ণে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজ্যের ষষ্ঠ পে কমিশনের সুপারিশের কার্যকাল ২০২৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর শেষ হয়েছে। আমি আনন্দের সঙ্গে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য সপ্তম পে কমিশন গঠনের ঘোষণা করছি। কমিশন রাজ্যের সকল সরকারি কর্মচারীদের আগামী দিনের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিষয়ে সুপারিশ করবে।

১৮. পেনশন প্রাপকদের রাজ্যের হেলথ স্কিমে চিকিৎসা সংক্রান্ত খরচ লাঘব করার উদ্দেশ্যে আমি ২ লক্ষ টাকার বর্তমান ক্যাশলেস সুবিধার সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করছি। সরকারি প্যানেলভুক্ত হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় তাঁদের চিকিৎসা খরচ ২ লক্ষ টাকা অতিক্রম করলে পরবর্তী বাড়তি খরচের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশলেস করা হবে। এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি শীঘ্রই প্রকাশিত হবে।

১৯. আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, রাজ্য সরকারি, আধা-সরকারি কর্মী, শিক্ষক ও অ-শিক্ষক কর্মী এবং পেনশন প্রাপকদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে রাজ্য সরকার আগামী ১লা এপ্রিল ২০২৬ থেকে ৪ শতাংশ হারে আরও এক কিস্তি মহার্ঘ ভাতা (DA) প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

২০. রাজ্যের ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী মাধ্যমিক (বা সমতুল্য) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষিত যুব সমাজকে কর্মসংস্থানের পথে সাহায্য করার জন্য সরকার 'বাংলার যুব-সাথি' নামে নতুন প্রকল্প চালু করছে। যাঁরা শিক্ষা সংক্রান্ত বা স্কলারশিপ ছাড়া রাজ্য সরকারের অন্য কোনও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না তাঁদের কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত সর্বাধিক ৫ বছর অবধি মাসে ১,৫০০ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। আগামী ১৫ই আগস্ট ২০২৬ থেকে এই প্রকল্প চালু হবে। এজন্য আগামী অর্থবর্ষে ৫,০০০ কোটি টাকা ব্যয়-বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।


২১. আপনারা অবগত আছেন যে, আমাদের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর চিন্তাপ্রসূত 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্পটি বাংলার মা-বোনেদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ইতিমধ্যে রাজ্যের ২ কোটি ২১ লক্ষ মা-বোনেরা এই প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন। আবেদনের ভিত্তিতে আরও ২০ লক্ষ ৬২ হাজার মা-বোনকে এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এখন রাজ্যের প্রায় ২ কোটি ৪২ লক্ষ মা-বোনেদের হাত আরও একটু শক্ত করতে আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত সকলের জন্য মাসিক আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে আরও ৫০০ টাকা বাড়ানো হল। এর জন্য আমি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে অতিরিক্ত ১৫,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।